ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,পূর্ব বর্ধমান: আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আদর্শ আচরণবিধি লাগু হওয়ার পর থেকেই ভোটারদের প্রভাবিত করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে কড়া নজরদারি শুরু করেছে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন। সোমবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, মদ এবং মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে খবর। জেলা নির্বাচনী দফতরের বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ১ কোটি ১৪ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকা মূল্যের নগদ ও নেশাজাত সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১৫ মার্চ নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধি অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারি প্রচারমূলক পোস্টার এবং ব্যানার অপসারণের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়। বিশেষত, জেলার প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে নাকা চেকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ ও মাদক পাচারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নাকা চেকিং পয়েন্ট থেকে মোট ১৭ লক্ষ ৮৭ হাজার টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আবগারি দফতর ও পুলিশি অভিযানে জেলাজুড়ে মোট ৩৬ হাজার ২৮০ লিটার মদ উদ্ধার করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৮১ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা। এছাড়াও প্রশাসনের জালে ধরা পড়েছে ৩ লক্ষ ১৪ হাজার টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ মাদক দ্রব্য। এই অভিযানের সময় তল্লাশি চালিয়ে আরও প্রায় ১২ লক্ষ টাকা মূল্যের বিভিন্ন সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যা ভোটারদের প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্যে আনা হচ্ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সামগ্রিক এই প্রশাসনিক তৎপরতা বর্তমানে জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচন বিধি কার্যকর হওয়ার পর থেকে জেলার বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে সরকারি প্রকল্পের প্রচারমূলক ১৯ হাজার ১৩৬ টি বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয় প্রশাসন। জেলাজুড়ে লাইসেন্স প্রাপ্ত মোট ৫ হাজার ২৪২ টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩ হাজার ৪২৭ টি বন্দুক পুলিশি হেফাজতে জমা নেওয়া হয়েছে। বাকি অস্ত্রশস্ত্র জমা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। জেলাশাসক শ্বেতা আগরওয়াল সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনের একাধিক নির্দিষ্ট টিম দিনরাত কাজ করছে। দ্রুততার সঙ্গে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে যাতে কোনোভাবেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ না হয়।
পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক আরও জানান যে, এই সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। বর্তমানে জেলায় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে মোট ৬৩ টি ফ্লাইং স্কোয়াড টিম (এফএসটি) এবং ৫৪ টি স্ট্যাটিক সারভিল্যান্স টিম (এসএসটি) নিরন্তর কাজ করে চলেছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নাকা চেকিংয়ের পাশাপাশি সন্দেহভাজন গতিবিধির ওপর আকাশপথে নজরদারি ও গোয়েন্দা নজরদারিও চালানো হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের বার্তা দিয়ে প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, সর্বস্তরে নির্বাচন বিধি কার্যকর করতে জেলা প্রশাসন সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ ও তৎপর রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মাদক উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটারদের প্রভাবিত করার অশুভ মানসিকতা থেকে একদল লোক যে সক্রিয় রয়েছে, এই উদ্ধারকার্য তারই প্রমাণ। তবে প্রশাসনের এই সক্রিয়তা ও কঠোর পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কতটা সহায়ক হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের এই অভিযান আগামী দিনে আরও ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের এই সাফল্য অন্যান্য জেলাগুলির কাছেও একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।












