সৌরীশ দে, বর্ধমান: আন্তর্জাতিক বিনোদন জগতের আঙিনায় ফের একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল বাংলার মুখ। জাপান ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করল পরিচালক রাজীব মণ্ডলের পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘রাইজ এন্ড সাইন’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অংশ নেওয়া ১১,৬৫৮ টি শর্ট ফিল্মের মধ্যে এই সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন বর্ধমানের রাজীব মন্ডল। সাকুল্যে ১৬ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই বিশেষ চলচ্চিত্রটি উক্ত চলচ্চিত্র উৎসবে মোট ছয়টি ভিন্ন বিভাগে সেরার শিরোপায় ভূষিত হয়েছে। অতি সম্প্রতি জাপান থেকে আসা আনুষ্ঠানিক ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে পরিচালককে এই বিশেষ সাফল্যের কথা জানানো হয়েছে। বর্ধমান শহরের বাসিন্দা রাজীব মণ্ডলের এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই খুশি জেলার সাংস্কৃতিক মহল এবং সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরা। প্রথমবার আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতামূলক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেই এমন অভাবনীয় প্রাপ্তি পরিচালকের আগামী পথচলার পাথেয় হয়ে রইল।


পরিচালক রাজীব মণ্ডলের বয়ান অনুযায়ী, এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছে মাত্র তিন দিন। অত্যন্ত সীমিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হলেও মান ও উৎকর্ষের দিক থেকে কোনো আপস করা হয়নি। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ দিতে মোট ১৮ জন সুদক্ষ কলাকুশলী দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতার মেলবন্ধনে তৈরি এই চলচ্চিত্রটি মূলত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সামাজিক বিষয়ের উপর আধারিত। বর্তমান ডিজিটাল যুগেও বাল্যবিবাহ এবং স্কুল ছুটের মতো অভিশাপ কীভাবে সমাজের একটি বড় অংশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তারই এক বাস্তবসম্মত প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ‘রাইজ এন্ড সাইন’ চলচ্চিত্রে। সরকারি স্তরে একাধিক সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও সমাজের গভীরে প্রোথিত এই ব্যাধি এখনও নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
চলচ্চিত্রটির মূল উপজীব্য বিষয় হলো, সামাজিক এই প্রবণতার বিরুদ্ধে খোদ নাবালক কন্যা এবং কিশোরদের সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ। শৈশব এবং কৈশোরের স্বপ্নগুলোকে যখন বাল্যবিবাহের বেড়াজালে আবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ঠিক কতটা হতে পারে, পরিচালক তা সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই ছায়াছবিটি শৈশব হারিয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি বর্ণনা করে। ‘রাইজ এন্ড সাইন’ এর মাধ্যমে এই বার্তাটিই ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কেবল প্রশাসনের একার চেষ্টায় নয়, বরং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব। বর্ধমানের মতো একটি মফস্বল শহর থেকে উঠে আসা প্রতিভার এই বিশ্বজয় আক্ষরিক অর্থেই অনুপ্রেরণাদায়ক।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যে ছয়টি বিভাগে এই চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান পেয়েছে, সেগুলি হলো— বেস্ট স্ক্রিনপ্লে অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট স্টোরি অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট সোশ্যাল অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট বেঙ্গলি ফিল্ম এবং বেস্ট ভিশনারি ফিল্ম মেকার অ্যাওয়ার্ড। চলচ্চিত্রের নেপথ্যে কারিগরি দক্ষতায় অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন দিলীপ চৌধুরী, যিনি ক্যামেরা, সম্পাদনা এবং শব্দ গ্রহণের দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য এবং পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন রাজীব মণ্ডল স্বয়ং। এর আগেও একাধিক ছোট ছবি তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই প্রথম উপস্থিতি এবং তাতেই ছক্কা হাঁকানো তাকে আগামীতে আরও অর্থবহ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটনির্ভর কাজ করতে উৎসাহিত করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।










