ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,রায়না: লোকসভা নির্বাচনের আবহে বঙ্গ রাজনীতিতে আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণের মাত্রা প্রতিদিন নতুন মাত্রা লাভ করেছে। রবিবার পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী মন্দিরা দলুইয়ের সমর্থনে এক বিশাল জনসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উক্ত সভা থেকে তিনি একদিকে যেমন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান পেশ করেছেন, তেমনই বিরোধী শিবির বিজেপি ও সিপিএম-কে একযোগে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতি এবং রাজ্যের প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ তুলে অভিষেক এদিন অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। তাঁর বক্তৃতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে রায়নার কৃষি পরিকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা।

এদিনের জনসভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, তৃণমূল কংগ্রেস ধর্মভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাঁর মতে, ভারতীয় জনতা পার্টিকে ভোট প্রদান করা কার্যত পূর্বতন বাম আমলের ‘হার্মাদ’ শক্তির প্রত্যাবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে। অভিষেক বলেন যে, এবারের লড়াই ধর্মের ভিত্তিতে নয় বরং কর্মের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। মানুষের মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এই লড়াইয়ে তিনি তৃণমূলকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কৌশলে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনধারণের মান নিম্নমুখী করছে।

রায়নার কৃষিপ্রধান ভৌগোলিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একগুচ্ছ নতুন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে গোবিন্দভোগ চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়ে স্থানীয় কৃষকদের চরম আর্থিক সঙ্কটে ফেলেছে। কৃষকদের এই দুরবস্থা লাঘব করতে তিনি ঘোষণা করেন যে, রায়নার আলু ও সবজি চাষিদের সুবিধার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত একটি অত্যাধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘর নির্মাণ করা হবে। একইসাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবিকে মান্যতা দিয়ে এলাকায় একটি নতুন ফায়ার ব্রিগেড বা দমকল কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। তাঁর এই উন্নয়নমুখী বার্তা কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে আশার আলো সঞ্চার করেছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং রান্নার গ্যাসের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে তোপ দাগেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন যে, একদা চারশো টাকার গ্যাস সিলিন্ডার এখন সাধারণ মানুষকে এক হাজার টাকার বেশি মূল্যে ক্রয় করতে হচ্ছে। বিজেপির এই ‘পকেট কাটার’ রাজনীতির বিপরীতে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর তুলনা করেন। তিনি বলেন, “মোদী নিচ্ছেন আর দিদি দিচ্ছেন।” লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার যেভাবে সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিচ্ছে, তাকেই তৃণমূলের মূল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রসঙ্গেও এদিন কড়া বার্তা দিতে দেখা যায় অভিষেককে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীর ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিজেপির প্রলোভনে পা দিয়ে যারা দলের ক্ষতিসাধন করতে চাইছে, তাদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না। আগামী ৪ঠা মে’র পরবর্তী সময়ে এই সকল ‘বিশ্বাসঘাতক’দের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি দাবি করেন যে, প্রথম দফার ভোটে বিজেপির রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে এবং দ্বিতীয় দফায় তাদের ‘হরিবোল’ সম্পন্ন হবে, যা বিরোধী শিবিরের অস্তিত্বকেই সঙ্কটে ফেলবে।
সবশেষে নোটবন্দি থেকে শুরু করে জিএসটি-সহ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থ নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি ভোটারদের গণতান্ত্রিকভাবে ‘বদলা’ নেওয়ার আহ্বান জানান। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, বিজেপি বারবার সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হেনস্থা করেছে, এবার সময় এসেছে ভোটকেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে ইভিএম-এর মাধ্যমে সেই অপশাসনের যোগ্য প্রত্যুত্তর দেওয়ার। রাজনৈতিক মহলের মতে, রায়নার এই জনসভা থেকে অভিষেকের বক্তব্য একদিকে যেমন দলের কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছে, তেমনই উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মন জয়ের চেষ্টাও করেছেন তিনি। সামগ্রিকভাবে, এই জনসভা তৃণমূলের আসন্ন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।








