ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,বর্ধমান: পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র জেলাশাসকের দফতরের সম্মুখে একটি সুপ্রাচীন বৃক্ষকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ বৃক্ষের তুলনায় এই গাছটির গঠনশৈলী অত্যন্ত ভিন্নধর্মী ও বিস্ময়কর। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গাছটিকে দেখলে মনে হয় এটি একটি উল্টো আকৃতির বৃক্ষ, যার শিকড়ের অংশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আকাশের দিকে উত্থিত হয়েছে এবং কাণ্ডের অংশটি মাটির অভ্যন্তরে প্রোথিত। ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণত এই ধরনের আকৃতির উদ্ভিদ প্রাকৃতিকভাবে দেখা যায় না। তবে উদ্ভিদবিদদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, এই বৃক্ষটির সাথে আফ্রিকার বিখ্যাত ‘বাউবাব’ (Baobab) গাছের প্রভূত সাদৃশ্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বর্ধমান শহরের জনবহুল এলাকায় এই গাছটি অবস্থান করলেও, জেলাশাসকের নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের কাজ চলার কারণে এটি এতদিন সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে ছিল। ভবন নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর মূল প্রবেশপথের পার্শ্ববর্তী এই অদ্ভুত দর্শন বৃক্ষটি এখন পথচারী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।


বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জয়প্রকাশ কেশরী এই বিষয়ে আলোকপাত করে জানিয়েছেন যে, আফ্রিকান বাউবাব গাছ তার স্বতন্ত্র গঠনের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই গাছটিকে স্থানীয়ভাবে ‘উল্টো গাছ’ বলা হয় কারণ শীতকালে যখন পাতা ঝরে যায়, তখন এর ঊর্ধ্বমুখী ডালপালাকে দেখে অবিকল গাছের শিকড় বলে ভ্রম হয়। বর্ধমান জেলাশাসক দফতরের সামনের গাছটি খালি চোখে দেখে বাউবাব প্রজাতির বলেই মনে হচ্ছে। তবে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে শীতকালীন পত্রহীন অবস্থার কারণে শুধুমাত্র বাহ্যিক আকৃতি দেখে প্রজাতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন নয়। গাছটির পূর্ণাঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য নতুন পাতা ও পুষ্পোদগম পর্যন্ত অপেক্ষা করা প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য যে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ইতিপূর্বে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু আফ্রিকান বাউবাব রোপণ করা হলেও, জেলাশাসক দফতরের এই গাছটি সম্ভবত প্রাকৃতিকভাবেই এখানে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সোমবার বর্ধমান বিভাগীয় বন দপ্তরের আধিকারিক অনির্বাণ মিত্র ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বন দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে যে, সরকারি নথিতে এই নির্দিষ্ট এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে আফ্রিকান বাউবাবের উপস্থিতির কোনও পূর্ব তথ্য নেই। আধিকারিকরা গাছটির নমুনা পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এই বৃক্ষটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক কৌতূহলও তৈরি হয়েছে, কেউ কেউ একে পুরাণে বর্ণিত ‘কল্পতরু বৃক্ষ’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। বৈজ্ঞানিকভাবে বাউবাব গাছ তার কাণ্ডের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জল ধরে রাখার ক্ষমতার জন্য পরিচিত, যা আফ্রিকার শুষ্ক মরু অঞ্চলে জীবনদায়ী হিসেবে কাজ করে। এই ‘এক্সোটিক প্লান্ট’ বা ভিন্ন মহাদেশীয় উদ্ভিদটি ভারতের এই অঞ্চলের জলবায়ুতে কীভাবে এবং কত বছর আগে অঙ্কুরিত হয়েছিল, তা এখন তদন্তাধীন বিষয়। স্থানীয় পরিবেশবিদরা এই বিরল প্রজাতির বৃক্ষটিকে অবিলম্বে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখার দাবি জানিয়েছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে বাউবাব গাছ সাধারণত বোনসাই হিসেবে জনপ্রিয় হলেও উন্মুক্ত প্রকৃতির বুকে এর বিশালাকার উপস্থিতি অত্যন্ত নগণ্য। আবহাওয়ার সামান্য তারতম্য থাকলেও এই গাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার এ দেশে কঠিন। তবে কিছু সংরক্ষিত অরণ্য ও নির্দিষ্ট এলাকায় এদের দেখা পাওয়া যায়। বর্ধমানের এই রহস্যময় গাছটির প্রজাতি নিশ্চিত হওয়া গেলে তা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গাছটির বয়স ও প্রজাতি নির্ধারণের পর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে এই অদ্ভুতদর্শন বৃক্ষটি বর্ধমান শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিজ্ঞান উৎসাহীদেরও সমানভাবে ভাবিয়ে তুলছে। আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে এই উদ্ভিদের উৎস সন্ধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।










