সৌরীশ দে,পূর্ব বর্ধমান: বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটেছে প্রায় এক দশকের বেশি সময় আগে। সময়ের সাথে সাথে বদলেছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, পাল্টেছে কর্মীদের আনুগত্যের ধরণ। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের দেবীপুর স্টেশনে গেলে আজও দেখা মেলে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের। সেখানে আশি বছরের বৃদ্ধ শিবশঙ্কর কর্মকার আজও নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে স্টেশনের ডিসপ্লে বোর্ডে আঠা দিয়ে সেঁটে দেন দলের মুখপত্র ‘গণশক্তি’। গত ৪৮ বছর ধরে এই কাজে একদিনের জন্যেও ছেদ পড়েনি। বয়সের ভারে শরীর নুইয়ে পড়েছে, দৃষ্টিশক্তিও হয়তো আগের মতো প্রখর নয়, কিন্তু লাল ঝান্ডার প্রতি তাঁর আবেগ আজও অমলিন। রোদ, জল কিংবা প্রবল বর্ষা— কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে তাঁর দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

এক সময় রাজ্যের প্রতিটি রেলস্টেশনে গণশক্তি পত্রিকা ডিসপ্লে বোর্ডে লাগানো থাকতো। নিত্যযাত্রীরা ট্রেনে ওঠা-নামার সময় এক পলক চোখ বুলিয়ে নিতেন সমসাময়িক রাজনৈতিক খবরে। তবে পরিবর্তনের হাওয়ায় ধীরে ধীরে অধিকাংশ স্টেশন থেকেই সেই চেনা ছবি হারিয়ে গিয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু দেবীপুর। শিবশঙ্কর বাবুর এই নিরলস পরিশ্রম এবং আদর্শের প্রতি একাগ্রতার তারিফ করেছেন দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকরাও। বাম আমলের সেই পুরনো ডিসপ্লে বোর্ডটি আজও সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন তিনি। আঠার কৌটো আর পত্রিকা হাতে তাঁর এই প্রতিদিনের যাত্রা আজ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এক পরিচিত এবং অনুপ্রেরণামূলক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিপিআইএম-এর স্থানীয় নেতৃত্বের মতে, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে শিবশঙ্করের মতো অনুগত এবং স্বার্থত্যাগী কর্মীর সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। দলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং নিজেকে সর্বক্ষণ দলের কাজে নিয়োজিত রাখার মানসিকতাই শিবশঙ্কর বাবুকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। এক প্রবীণ বাম নেতার কথায়, ‘শিবুর মতো কর্মীরা আজও টিকে আছেন বলেই আমাদের লড়াইয়ের রসদ ফুরিয়ে যায়নি।’ রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মতাদর্শের প্রতি এই গভীর নিষ্ঠাই হতে পারে যেকোনো রাজনৈতিক দলের ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চাবিকাঠি। তদন্তাধীন কোনো বিষয় নয়, বরং এটি এক জনজীবনের জলজ্যান্ত উদাহরণ।
শিবশঙ্কর কর্মকার মনে করেন, পদ বা ক্ষমতার লোভ তাঁর কাছে বড় নয়; বরং দলের আদর্শ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তাঁর এই দীর্ঘ ৪৮ বছরের সফর কেবল একটি সংবাদপত্রের প্রচার নয়, বরং এক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আজীবন অঙ্গীকার। আজকের যুব প্রজন্মের কর্মীদের কাছে শিবশঙ্কর বাবু এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যিনি প্রমাণ করেছেন যে রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে থাকে ব্যক্তিগত আদর্শ এবং দলের প্রতি অকৃত্রিম সততা। দেবীপুর স্টেশনের সেই জরাজীর্ণ ডিসপ্লে বোর্ডটি আজও সাক্ষী দিচ্ছে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের, যা কোনো নির্বাচনী ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না।










