ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক, বর্ধমান: রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্যজুড়ে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, গত ০৩ মার্চ কলকাতার ভবানীপুর এলাকায় এক জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি মন্তব্য করেন যে ‘হিন্দুস্তানে নাস্তিকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্থান নেই এবং সেখানে কেবল হিন্দুদের রাজত্ব চলবে।’ বিরোধী দলনেতার এই বয়ানকে অসাংবিধানিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী আখ্যা দিয়ে সরব হয়েছে নাস্তিক মঞ্চের বর্ধমান জেলা কমিটি। শুক্রবার এই সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা সম্পাদক রাজেন সামন্তর নেতৃত্বে বর্ধমান থানায় একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার আবেদন জানানো হয়েছে।


সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্য কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি সরাসরি ভারতের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর উপর এক গুরুতর আঘাত। ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লিখিত রয়েছে এবং সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিককে স্বধর্ম পালন এবং বিবেকের স্বাধীনতা প্রদান করেছে। নাস্তিক মঞ্চের মতে, জনসমক্ষে এই ধরনের উসকানিমূলক কথা বলে তিনি সমাজের এক বিশেষ অংশের মানুষের ভাবাবেগে আঘাত করেছেন এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বিশেষত একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংবিধানের তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী তিনি যে সত্যনিষ্ঠা ও অখণ্ডতা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন, এই মন্তব্য সেই শপথেরই পরিপন্থী বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাস্তিক মঞ্চের জেলা সম্পাদক রাজেন সামন্ত জানিয়েছেন যে, তারা সংবিধান অবমাননা এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি রাখছেন। বর্ধমান থানায় জমা দেওয়া সেই আবেদনে পুলিশকে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারাগুলির অধীনে এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত শুরু করা হয়। অভিযোগকারীদের মতে, যদি এই ধরনের প্রকাশ্য ঘোষণা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে তা সামাজিক সংহতির জন্য বড়সড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য ধর্মের কার্ড খেলা এবং সংবিধানের অবমাননা করা কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না।

বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও যথেষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে যখন শাসকদল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই মন্তব্যকে অগণতান্ত্রিক বলে সরব হয়েছে, অন্যদিকে বিরোধী শিবির থেকে এই বিষয়ে এখনও কোনো বিশদ প্রতিক্রিয়া মেলেনি। নাস্তিক মঞ্চের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সংবিধান রক্ষা এবং সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করতে তারা এই লড়াই শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাবেন। পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদনটি গ্রহণ করা হলেও, এই বিষয়ে কবে নাগাদ এফআইআর নথিভুক্ত করা হবে বা আদৌ কোনো তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না, তা নিয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
শুভেন্দু অধিকারীর এই মন্তব্য ঘিরে যে আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের মত। নাগরিক সমাজের এক বড় অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক ভাষণে যদি সংবিধানের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করা হয়, তবে তা দেশের বিচারব্যবস্থার সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। বর্ধমান থানার পক্ষ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেওয়া হয় এবং বিরোধী দলনেতা নিজে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী সাফাই দেন, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। আপাতত এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ধমান জেলা সহ রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ ক্রমবর্ধমান।










