ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,বর্ধমান: বর্ধমানের নূতনপল্লী মৌসুমী অ্যাথলেটিক ক্লাবের দুর্গাপূজা মানে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দীর্ঘ ৭১ বছরের ঐতিহ্য, মানুষের ভালোবাসা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদযাপন। ছোট একটি ঘর থেকে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি বৃহৎ সামাজিক পরিচিতি লাভ করেছে, যা অঞ্চলের আবেগ ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৫৭ সালের ১৫ মে কিছু প্রবীণ সমাজসেবী এবং স্থানীয় মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই ক্লাব। তবে দুর্গাপূজার সঙ্গে এই স্থানের সম্পর্ক আরও প্রাচীন। ক্লাবের জন্মেরও আগে থেকেই এই প্রাঙ্গণে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যা ক্লাবের পথচলাকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তুলেছে। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট ক্লাবঘর এখন খেলাধুলা ও সমাজসেবার পাশাপাশি এক বৃহত্তর সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। আজ ক্লাবের দুর্গাপূজা এলাকার মানুষের কাছে আড়ম্বরের চেয়ে আন্তরিকতা, প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা এবং ব্যক্তিগত আনন্দের চেয়ে সম্মিলিত উৎসবের আবহ তৈরি করে। এটি মূলত পাড়ার পুজো, যেখানে প্রতিটি নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে মায়ের আরাধনা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং ভক্তিভরে উৎসব উদ্যাপন করা হয়।
ক্লাবের সম্পাদক পলাশ ব্যানার্জি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজাকে আরও আকর্ষণীয় ও ঐতিহ্যমণ্ডিত করে তুলতে ক্লাব এক নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মহাসপ্তমীর সকালে ঘট আনার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হচ্ছে এক মনোমুগ্ধকর শোভাযাত্রা ও প্রদর্শনী। ঢাক-ঢোল, শাঁখ, কাঁসর-ঘণ্টা এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুমধুর ধ্বনিতে মুখরিত হবে এলাকার পথঘাট। ভক্তি ও উৎসাহে ভরপুর এই শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে ঘট নিয়ে আসা এবং মায়ের আরাধনার সূচনাকে ঘিরে এক বিশেষ উৎসবের আবহ তৈরি হবে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো পুরনো ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সুন্দরভাবে তুলে ধরা এবং এলাকার মানুষকে একসূত্রে বাঁধা।

ক্লাব কমিটির সদস্য রামকৃষ্ণ আম্বুলী, তাপস দে, গোবিন্দ সাহা, দেবজ্যোতি মিত্র, পলাশ মজুমদার, দেবাশিস বসু, রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীসহ সকলের সম্মিলিত প্রয়াস ও সদিচ্ছায় ক্লাবের এই নতুন ভাবনা অতীত ঐতিহ্য এবং বর্তমান প্রজন্মের উদ্যমের এক সুন্দর মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও নবীনদের সৃজনশীল উদ্যোগ একসঙ্গে মিলিত হয়ে ক্লাবের দুর্গাপূজাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার স্বপ্ন দেখছে। উল্লেখ্য, মহালয়ার ভোরের শুভলগ্নে ক্লাবপ্রাঙ্গণ ধূপ ধূনোর গন্ধে মুখরিত করে মায়ের আগমনের জন্য অধীর আগ্রহের সঙ্গে ভক্তিভরে শ্রী বীরেন্দ্রকিশোর ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী শোনার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ক্লাবের সদস্য দেবজ্যোতি মিত্র জানিয়েছেন, এই ক্লাবের দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো প্রতি বছর নবমীর দিন দুপুরে আয়োজিত ভোগপ্রসাদ বিতরণ। এটি কেবল পুজোর প্রসাদ নয়, এটি ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য বন্ধন। এলাকার মানুষ তো বটেই, দূরদূরান্ত থেকেও বহু মানুষ এই ভোগপ্রসাদ গ্রহণ করতে আসেন, ভাগ করে নেন উৎসবের আনন্দ। এখানে ভোগের পংক্তিতে ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সকলেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যান, যা উৎসবের প্রকৃত সার্থকতাকে তুলে ধরে।
ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াই এখন নূতনপল্লী মৌসুমী অ্যাথলেটিক ক্লাবের অন্যতম লক্ষ্য। নতুন কমিটির সদস্যরা ক্লাবকে আরও আধুনিক, সুসংগঠিত ও কর্মমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে আগ্রহী। তাঁদের ভাবনায় রয়েছে নতুন পরিকল্পনা, যেমন ক্রীড়াক্ষেত্রে আরও উন্নতি, সমাজসেবামূলক কর্মসূচির সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা সংযোজন এবং দুর্গাপূজার ঐতিহ্যকে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রবীণদের আশীর্বাদ, এলাকার মানুষের সহযোগিতা এবং নবীন প্রজন্মের উদ্যম একত্রিত হলে এই ক্লাব আগামী দিনে আরও গৌরবময় অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে বলে তাঁদের বিশ্বাস।








