ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,বর্ধমান: চলতি মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র তাপপ্রবাহ। বর্ধমান জেলাতেও তাপমাত্রা এক ধাক্কায় পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এর কোঠায়। একটানা চারদিনেরও বেশি সময় ধরে বৃষ্টিহীন, শুষ্ক ও দহনকারী আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি চরম সংকটে পড়েছে বর্ধমানের রমনাবাগান জুলজিক্যাল পার্ক-এর বন্যপ্রাণীরা। এই তীব্র প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাঁচাবন্দি জীবজন্তু ও পাখিদের প্রাণহানির ঝুঁকি এড়াতে এবং তাদের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বিশেষ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বন দফতর তথা উদ্যান কর্তৃপক্ষ।

রমনাবাগান মিনি জু-তে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণের সহাবস্থান রয়েছে। এখানে গভীর অরণ্যের হিংস্র স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির জলচর জীব, সরীসৃপ ও বর্ণিল পাখি। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে খাঁচাবন্দি প্রাণীদের হিট স্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাঘ ও ভাল্লুকের মতো গরম রক্তের মাংসাশী প্রাণীদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই বিপর্যয় রুখতে বন্যপ্রাণীদের খাদ্যতালিকায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। হরিণ এবং অন্যান্য শাকাহারি প্রাণীদের জন্য দৈনিক খাদ্যতালিকায় তরমুজ, আনারস, লেবু ও শসার মতো জলসমৃদ্ধ মরশুমি ফলের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে। এছাড়াও সমস্ত প্রাণীর এনক্লোজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট) মিশ্রিত পানীয় জলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঘ ও ভাল্লুকের মতো ভারী শরীরের স্তন্যপায়ীদের শীতল রাখা। রমনাবাগান কর্তৃপক্ষ বাঘের খাঁচায় রোদের সরাসরি প্রবেশ রুখতে উপরে খড়ের পুরু ছাউনির ব্যবস্থা করেছে। এর পাশাপাশি দিনে অন্তত দুবারের বেশি সময় ধরে বাঘেদের ঠান্ডা জলে স্নান করানো হচ্ছে। অন্যদিকে, ভাল্লুকের খাঁচায় জলের বড় জলাধার সর্বদা পূর্ণ রাখা হচ্ছে যাতে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের শরীর ভিজিয়ে নিতে পারে। ভাল্লুকের খাদ্যতালিকাতেও এসেছে ব্যাপক রদবদল। অতিরিক্ত চর্বি ও তাপ উৎপাদনকারী মধু দেওয়ার পরিমাণ শীতকালের তুলনায় অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে শীতকালে একটি ভাল্লুককে প্রতিদিন প্রায় ১ কেজি মধু দেওয়া হত, সেখানে বর্তমান গ্রীষ্মে তা কমিয়ে দৈনিক ৫০০ গ্রাম করা হয়েছে এবং তার বদলে তরমুজ, সবুজ শাকসবজি ও ফাইবার সমৃদ্ধ তাজা ফল দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যানে বর্তমানে প্রায় ৪০০টি বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ রয়েছে। তীব্র গরমে হরিণদের যাতে জলের অভাব না ঘটে, তার জন্য তাদের খাঁচায় বসানো হয়েছে একাধিক জলের বড় পাত্র। নিয়মিত বিরতিতে সেই জল পরিবর্তন করে ঠান্ডা জল সরবরাহ করা হচ্ছে। পাখিদের খাঁচাগুলিও যাতে তপ্ত দুপুরের রোদে উত্তপ্ত না হয়ে ওঠে, তার জন্য খাঁচার উপর বিশেষ ছাদ বা ছাউনি তৈরি করা হয়েছে এবং কৃত্রিমভাবে ঠান্ডা হাওয়া চলাচলের জন্য বিশেষ নেট বা পর্দার ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই সামগ্রিক বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বিভাগীয় বনাধিকারিক সঞ্চিত শর্মা জানিয়েছেন, “বনদফতরের চিকিৎসকেরা নিয়মিত পশুপাখিদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। খাবারের পাশাপাশি জীবজন্তুদের ওআরএস খাওয়ানো হচ্ছে। গরমের হাত থেকে রক্ষা করতে যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও মাল্টি-ভিটামিন খাওয়ানো হচ্ছে যাতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় থাকে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম আবহে বন্যপ্রাণীদের কৃত্রিম উপায়ে সুস্থ রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া হলেও রমনাবাগান কর্তৃপক্ষের এই সময়োপযোগী ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে। পরিবেশবিদদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের তীব্র তাপপ্রবাহের প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় চিড়িয়াখানাগুলির পরিকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশ-বান্ধব ও তাপ-প্রতিরোধী করে গড়ে তোলাই হবে একমাত্র স্থায়ী সমাধান।








