ঋষিগোপাল মণ্ডল: ভোট আসিলেই নেতাদিগের দরদ উথলাইয়া ওঠে। সস্প্যানে ফুটন্ত দুগ্ধ উথলানোর ন্যায়। সে কি দরদ! এই নেতা সেলুনে ঢুকিয়া পাব্লিকের দাড়ি কামাইয়া দিতেছেন। সেই নেতা সটান হেঁশেলে ঢুকিয়া রুটি বেলিয়া দিতেছেন। সেইদিন দেখিলাম, সুবেশা এক নেত্রী রাস্তার এক পূতিগন্ধময় ভিখারিনীর চরণতলে বসিয়া আছেন। ভিখারিনীর পা জড়াইয়া। দুই পয়সার প্রেসকে চোখ টিপিয়া বলিতেছেন; খিচ মেরি ফোটো…। এরপরেই ব্রেকিং নিউজঃ “প্রচারে বেরিয়ে ভিখারিনীর পা ছুঁয়ে প্রণাম প্রার্থীর!” কোথায় যেন এক ভোট প্রার্থী সটান শৌচাগারে ঢুকিয়া হাগু করিতে বসা এক পাবলিককে হাত জোড় বিনয়াবতার হইয়া কাঁচুমাচু জিজ্ঞাসা করিয়াছে… “স্যার ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড আমি কি আপনাকে ধৌতকর্ম করাইয়া দিব? আপনাদিগের সেবা করিবার নিমিত্তই তো আমাদিগের জন্ম। জনম সার্থক করিবার সুযোগ দিন মহানুভব! প্লিজ। একবার দিন।’’ আপনাকে বলিতেছি; এবারের বিধানসভা না মেটা পর্যন্ত চানঘরে যাইলে ভালো করিয়া খিল/ হুড়কো আটকাইয়া বসিবেন।

ভোট আসিলেই নেতা নেত্রীদের এলাকায়, পাড়ায়, ঘরের দুয়ারে, বিছানার শিয়রে, বাড়ির উঠোনে করজোড়ে হামেশাই দেখা মেলে। ভোট মিটিলেই সব ভোঁ-ভা। ভোটের আগে নেতানেত্রীরা আপনার পিছনে ছুটিবে। আগামী ৫ বছর আপনার ভোটে জেতা নেতানেত্রীর পিছনে আপনি ছুটিবেন। ইহা এক প্রকার সরল অঙ্ক। ইলেক্টোরাল অ্যারিথমেটিক। এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে ভোট আসিলেই নানা কিসিমের রঙ্গ দেখা যায়। এই বিষয়ে সত্যজিত রায়ের সিনেমায় গান ছিলঃ কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়/ ও ভাইরে ও ভাই কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।/ আমি যেই দিকেতে চাই/ দেখে অবাক বনে যাই/ আমি অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাইরে,/ ও ভাই অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাইরে।

অর্থ খুঁজে পাই না মানে কী? অর্থের ছড়াছড়ি মশাই। আপনি অকর্মার ঢেঁকি, তাই অর্থ খুঁজে পান না। সেদিন দেখিলাম এক প্রার্থী পথচলতি একজনের হাতে টাকা গুঁজিয়া দিতেছেন। কী বলিলেন? প্রার্থী নিজের ইনকামের/ ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের/ সোনার দুল বেচা অর্থ দান করিতেছেন? হাহাহোহোহিহি। প্রতিবার নির্বাচনে প্রার্থীদের খরচের বহর ক্রমশ বাড়িতেছে। কোথা হইতে আসিতেছে এই অর্থ ? ব্যাপক ফান্ডিং মশাই। টাকা উড়িতেছে। উরি উরি বাবা কি দারুণ। কিন্তু কারা জোগায় নির্বাচনের এই বিপুল খরচ? গৌরি সেনরা আছে। কর্পোরেট গৌরি সেন। আটকানো প্রোজেক্ট ক্লিয়ার করিবার আশায় থাকা গৌরি সেন। আর পার্টির নিজের খরচ তো আছেই। গরিবের লাগি , দেশের-দশের সেবার লাগি বেদনাহত থাকা ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি কি পরিমান মাল্লু কামাইয়াছে এক নজরে দেখিয়া চক্ষু সার্থক করুন। ১. BJP — ₹৫৫৯৪+ কোটি, ২. TMC — ₹১৫৯২+ কোটি, ৩. Congress — ₹১৩৫১+ কোটি, ৪. BRS — ₹১১৯১+ কোটি, ৫. BJD — ₹৭৭৫+ কোটি, ৬. DMK — ₹৬৩২+ কোটি, ৭. YSRCP — ₹৩২৮+ কোটি, ৮. TDP — ₹২১১+ কোটি, ৯. Shiv Sena — ₹১৫২+ কোটি, ১০. RJD — ₹৭২+ কোটি। (সুত্রঃ https://myneta.info/party/)

এগুলি পুরাতন হিসাব। গত লোকসভা নির্বাচনের আগের হিসাব। গত কয়েক বছরে গরিবের জন্য কাঁদিয়া ভাসাইয়া দেওয়া পার্টিগুলির সম্পত্তি আরও কয়েক গুণ বাড়িয়াছে। ইহার সহিত বিপুল অর্থের ইলেক্টোরাল বন্ডের টাকা জুড়িলে চক্ষু চড়কগাছ হইবে। মনটা খচখচ করিতেছে? মেহনতি মানুষের পার্টি, ক্ষেত মজুরের পার্টি, গরিবের পার্টি সিপিআইএমের সম্পত্তির পরিমান জানিতে মন চায়? Communist Party of India (Marxist) বা CPI-M-এর সম্পদের পরিমাণ ২০২০–২১ অর্থবছরে ₹৬৫৪.৭৯ কোটি থেকে বেড়ে ২০২১–২২ অর্থবছরে ₹৭৩৫.৭৭ কোটিতে পৌঁছেছে। ২০২১–২২ অর্থবছরে তাদের মোট সম্পদ প্রায় ₹৭৩৫.৭৭ কোটি ছিল। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দলের মোট আয় ছিল প্রায় ₹১৬৭.৬৩ কোটি এবং ব্যয় ছিল ₹১২৭.২৮ কোটি (সূত্রঃhttps://adrindia.org/content/rs-6000-crore-bjp-has-highest-assets-among-top-eight-political-parties-adr-report)। ২০২৬ এ আসিয়া সর্বহারাদের পার্টির সম্পত্তির পরিমাণ কত হইতে পারে সহজেই অনুমেয়।
নির্বাচনের মরশুমে টাকা উড়িয়া বেড়ায়। ধরিতে জানিতে হয়। আর অনেকানেকের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যম, সাংবাদিকণের একাংশ এই ধরাধরির খেলায় বেশ দড়। ওস্তাদ। এলাকার ফুটো পয়সার নেতাকে দেখাইয়া দেখাইয়া, পেইড নিউজের দুদু ও তামাক খাইয়া কত ২ পয়সার সাংবাদিক কত ভেড়াকে সিংহ বানাইয়াছেন তাহার হিসাব কে করিবে? এই যেমন – নেতা চাল দিলেন। নেত্রী গা ধুইতে গেলেন। নেতা এই মাত্র ৩৪ বছর পর নর্দমা পরিস্কার করিলেন। নেত্রী আজ ওলাইচণ্ডীর ব্রত রাখিলেন। নেতা তাঁহার চোতাদিগের ইফতারে গেলেন। নেত্রী আজ নিজের হাতে সিন্নি মাখিলেন। নেতা লুঙ্গি পরিয়াই বড় বাইরে গেলেন। নেত্রী ছোট বাইরে করিয়া কাপড় পাল্টান নাই বলিয়া বিরোধীরা কটাক্ষ করিল… মার্কা ব্রেকিং নিউজে দুই পয়সার প্রেস ম’ ম’ করিতেছে। প্রথম ম-য়ে মানি। দ্বিতীয় ম-য়েও মানি। প্রচুর মানি।
এইবারের বিধানসভায় না কি ইউটিউবার, ইনফ্লুয়েন্সার, নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকদিগকে ব্যাপক ফান্ডিং করা হইবে। কোন প্রোফাইলে কী হইতেছে ইলেকশন কমিশনও নজর রাখিবে।
এই লেখকের ন্যায় দু এক গাছা অকর্মণ্য, অপদার্থ সাংবাদিক কিছু না পারিয়া, কিছু না পাইয়া স্যাড সঙ গাহিবে… আমি অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাইরে,/ ও ভাই অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাইরে। অবশ্য এই সকল অর্থ হীন খবর, এই সকল ‘অর্থ’হীন সাংবাদিককে পাত্তা না দিলেও চলিবে। জয় বাংলা। জয় হিন্দ।








