ঋষিগোপাল মণ্ডল: “বন্ধুগণ, আপনারা তো জানেন, আপনাদের সুবিধার কথা একমাত্র আমাদের পার্টিই ভাবে। মানুষের কথা ভাবে। ইতিমধ্যেই আমরা ২০ কোটি বেকারের চাকরি দিয়াছি। প্রতিটা কল হইতে গবগবাইয়া মিনারেল ওয়াটার আসিতেছে। ঘরে ঘরে বিজলি। বিজলি গর্জে চমক গয়ে হম। মার্বেল বাঁধানো পথঘাট। ট্রাফিকে উন্নয়ন দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে… কোকিল ডাকিতেছে। অইটা আমাদেরই পার্টির কোকিল। যে কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করিয়া সাজানো রাস্তায় পটি করিয়া গেল, অইটা বিরোধীদের সারমেয়। লজ্জা লাগা দরকার…
“…কুসুমাস্তীর্ণ রাস্তা। একটাও খানাখন্দ নেই। যদি থাকে, জানিবেন ঢ্যামনা বিরোধীরা এ আই দিয়া বানাইয়াছে। হাসপাতালে টিফিনবেলায় বিরিয়ানি (মাটন), সরকারি দপ্তরে পজিটিভ কর্মী, জলের দরে ফলের রস ও পেট্রোল ডিজেল আমরাই দিয়াছি। প্রতিটা নাগরিকের অ্যাকাউণ্টে ১৫ লক্ষ টাকা, চাল, গম, চিনি, মোবাইল, চাউমিন আমারাই দিয়াছি। চাউমিনের চিলি সসও। আর একবার আমাদের বিপুল ভোটে জয়ী করুন… আপানদের এত দিবো অ্যাতো দিবো…”

প্রাগুক্ত দুই প্যারার ভাষণ আসলে গ্যাস। এমন গ্যাস আসলে সব পার্টিই কমবেশি দিয়া থাকে। শিয়রে নিবাচন আসিলে এই ধরণের গ্যাস বেশি মেলে। তবে সম্পাদক মহাশয় ফরমায়েশ করিয়াছেন দেশ জুড়িয়া এলপিজি গ্যাসের যে হাহাকার, কালোবাজারি তাহা লইয়া লিখিতে হইবে। আমি সাধারণত গ্যাস দিই না। সরবরাহ করি না। তাই গ্যাস বিষয়ে রচনা লিখিবার লাগি যোগ্যতামান নাই।
গ্যাস আসলে অ্যাপলিটিকাল। অরাজনৈতিক কেস। ইহা লইবার জন্য সকলেই লাইনে দাঁড়ায়। না পাইলে অশান্তি পোহায়। গ্যাস এমন এক বায়বীয় ব্যাপার যাহা সকলেই কমবেশি দিয়া থাকেন। তেমন সুযোগ পাইলে গুছাইয়া গ্যাস দেন। এক্ষেত্রে রাম-বাম-ভাম সকলেই সমান। ইন্ডেন, ভারত, হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়াম…সকল কিসিমের গ্রাহকের সংসারে কখনও না কখনও গ্যাস লইয়া অশান্তি হইয়াছে। গ্যাসের সমস্যায় শরীর বিগড়াইয়াছে। অথবা সুযোগ বুঝিয়া এন্তার গ্যাস দিয়াছেন। আর বাঙালি তো বরাবরই গ্যাসের সমস্যায় জেরবার। এই রাজ্যের রাস্তায় প্রতি সাড়ে ৩ মিটার অন্তর একটি বিজ্ঞাপন থাকিবেই থাকিবে…আপনি কি গ্যাস, অম্বল, বুকজ্বালা, চোয়া ঢেকুর…ইত্যাদি প্রভৃতি।

ছ্যাব্লামি সরাইয়া আপনাকে আশ্বস্ত করিয়া বলি; রান্নার গ্যাস লইয়া যে চিপাবাজি চলিতেছে, যে কালোবাজারি চলিতেছে তাহা ম্যানমেড। তৈয়ার করা। দেশে যথেষ্ট রান্নার গ্যাস মজুত আছে। ঘরেলু এবং কমার্শিয়াল, উভয়ই। হারামি ও অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার আর দালালরা দেশে গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈয়ার করিয়াছে। অন্যদিকে, পেট্রলের কেসটাও সেম। দেশে এল পি জি গ্যাস ও পেট্রোল আশানুরূপ মজুত আছে। টেনশন করিবেন না। কী? বিশ্বাস হইলো না? এই অনুচ্ছেদে আপনাকে গ্যাস খাওয়াইলাম; এমন ভাবিতেছেন? গ্যাস খাইতে-খাইতে আর দিতে-দিতে আপনি দিন দিন একটা মোটা, বেঢপ গ্যাস সিলিন্ডার হইয়া ওঠেন নাই তো! ঘরেলু কিংবা কমার্শিয়াল?
সংবাদে প্রকাশঃ “৬০ দিনের তেল ও ৮ লক্ষ টন LPG মজুত আছে’, দেশজুড়ে আতঙ্কের মধ্যে আশ্বস্ত করল কেন্দ্র।” ঋষিগোপালের সাধুভাষা ছাড়িয়া চলিত ভাষায় চলতি খবরে ঈষৎ চোখ রাখিতে পারেনঃ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির (Middle East War) আবহে দেশে জ্বালানি এবং রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে বড় আশ্বস্তবার্তা দিল কেন্দ্রীয় সরকার। সরকার জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে পেট্রোল, ডিজেল এবং এলপিজি মজুত রয়েছে, তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই। কেন্দ্রের আশ্বাসের মূল বিষয়গুলো: পর্যাপ্ত মজুত: দেশে আগামী ৬০ দিনের জন্য অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি মজুত রয়েছে। এছাড়া, ৮ লক্ষ টন এলপিজি (LPG) সরবরাহ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা: সরকার সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার এবং আতঙ্কিত হয়ে বেশি তেল বা গ্যাস না কেনার (Panic Buying) পরামর্শ দিয়েছে। বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহ: হোটেল-রেস্তোরাঁ সহ বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, যা চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। কঠোর নজরদারি: মজুতদারি বা কালোবাজারি রুখতে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় পণ্য আইনে (Essential Commodities Act) ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পিএনজি (PNG) ব্যবহারে উৎসাহ: রান্নার গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পিএনজি (Piped Natural Gas) ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সরবরাহ সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ভুয়া তথ্য ছড়ালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুলিলে চলিবে না, গ্যাস আসলে অসাম্প্রদায়িক। একই সিলিন্ডারের গ্যাসে দুই পশুর মাংস রান্না হইতে দেখিয়াছি। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় আঙুল চাটিয়া খাইয়াছেন। কোন পশুর মাংস কে খাইয়াছেন তাহা নিজ বিবেচনা অনুযায়ী সাজাইয়া লউন।

সংবাদ সংগ্রহে, ভোটের আগে একবার গিয়াছিলাম পানাগড় বাজার। প্রবল ক্ষুধা লইয়া কয়কেজন সাংবাদিক রাস্তার ধারে ‘মা তারা হিন্দু হোটেলে’ ঢুকিলাম। গলায় লাল চেক গামছা আর কপালে সিন্দুরের তিলক টানা হোটেল মালিক বলিলেন…“বসুন, বসুন! ডাল, সবজি, চিকেন, মাছ সবই আছে। শুধু ভাতটা শেষ হয়ে গেছিল। অই যে গ্যাসে বসিয়েছি ডেকচিতে। এখনই হয়ে যাবে।” ফুটন্ত ভাতের দিকে তাকাইয়া আমার কয়েকজন বুভুক্ষু বসিলাম। সিগ্রেট টানিতে গিয়া দেখিলাম উহাও শেষ। তিলক-টানা তারা মায়ের অথবা মা তারার ভক্ত দোকানি বলিলেন, “চিন্তা করবেন না, পাশেই আমাদের দোকান আছে…হোটেল আছে, ওখান থেকে সিলিন্ডার এনে লাগিয়ে দিচ্ছি। এখনই হয়ে যাবে, গরমাগরম খাবেন।” আমি এবং চব্বিশ ঘণ্টা চ্যানেলের পার্থদা(চৌধুরী) মা তারা হোটেলের বাহিরে আসিয়া সিগ্রেটের দোকানের সন্ধান করিতেছি, এমন সময় দেখি কিছু দূরে রহমানিয়া মুসলিম হোটেল হইতে গ্যাস সিলিন্ডার কান্ধে বাহির হইতেছে মা তারা হিন্দু হোটেলের রাঁধুনি।
গ্যাসের কোনও ধর্ম নাই। জাত নাই। টিকি বা দাড়ি নাই। তিলক বা তসবি নাই। মন্ত্র বা আজান নাই। রাম বা রহিম নাই। ঘাস কিংবা পদ্ম ফুল নাই। গ্যাস সকলেই নেন। সুযোগ পাইলে গ্যাস সকলেই দ্যান।
জয়ত্তারা। ইনশাল্লাহ।








