ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,বর্ধমান: প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে আজও স্বমহিমায় পালিত হচ্ছে ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপূজা, যেখানে দেবী দুর্গা পূজিত হন তাঁর এক ব্যতিক্রমী রূপ, ভদ্রকালী রূপে। এই পূজার বিশেষত্ব হলো দেবীর কালো গাত্রবর্ণ এবং সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে আরাধনা। এই ঐতিহ্যবাহী পূজা শুরু হয়েছিল অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলায়, হরিদেব ভট্টাচার্যর হাত ধরে। তাঁর স্বপ্নাদেশেই দেবী এই ভদ্রকালী রূপে আবির্ভূতা হন।

বংশ পরম্পরায় অষ্টম পুরুষ ধরে চলে আসা এই পুজো বর্তমানে এক অনন্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার বর্ণময় রূপের থেকে ভিন্ন, এখানে দশভূজা দেবীর গায়ের রঙ কৃষ্ণবর্ণ। তবে দেবীর পুত্র-কন্যাদের গায়ের রঙ অবশ্য স্বাভাবিকই থাকে। এই বিশেষ প্রতিমা বর্ধমানের দীনবন্ধু পাল তৈরি করেন। একচালা এই প্রতিমায় কার্তিক ও গণেশকে প্রচলিত ধারার বিপরীতে স্থাপন করা হয়, যেখানে গণেশ থাকেন দেবীর বামে এবং কার্তিক ডানে।
দেশভাগের আগে ১৯৪৬ সালে পরিবারটির কলকাতা আগমনের পূর্বে নীরদ গোপাল ভট্টাচার্য ১৯৩৫ সাল নাগাদ কর্মসূত্রে আসানসোলে আসেন এবং তাঁর জ্যাঠারা ১৯৩৯ সালে কলকাতায় চলে আসেন। বাংলাদেশ থেকে চলে আসার পর কালনার গুপ্তিপাড়া, আসানসোল এবং দুর্গাপুরেও এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত দুর্গাপুরে এবং পরবর্তীতে কলকাতার বেলেঘাটায় পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ২০১৩ সাল থেকে জয়ন্ত ভট্টাচার্য তাঁর গুরুদেবের নির্দেশে বর্ধমানের ৫ নং ইছলাবাদের নিজ বাসভবনে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ভট্টাচার্য পরিবারের এই ভদ্রকালী পূজা তন্ত্রমতে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রচলিত ধ্যানের কিছুটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে এই পূজা চলে দশমী পর্যন্ত। প্রতিদিনের ভোগে আড়, বোয়াল, কাতলা, পাবদা-সহ বিভিন্ন প্রকার মাছ নিবেদন করা হয়। নবমীর দিনে ইলিশ মাছ আবশ্যিকভাবে থাকে। সপ্তমীতে খিচুড়ি এবং অষ্টমীতে পোলাও সহ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। নবমীর দিন পাঁঠা বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে, যেখানে ফ্রায়েড রাইসের সাথে দুই প্রকার মাছের পদ ভোগে দেওয়া হয়। সপ্তমী, সন্ধিপূজা এবং নবমী—এই তিন দিনই পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। সন্ধিপূজায় ভদ্রকালী দুর্গারূপিণী চামুণ্ডার আরাধনা করা হয়।
দশমীর দিনে মাকে পান্তা ভাত, লেবু, কাঁচা লঙ্কা, টক দই, ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক, পাঁচ রকম ভাজা এবং দুই প্রকার তরকারি দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। এটি এই পূজার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী দিক। পঞ্চমীতে গুরুপূজা এবং প্রতিদিন চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে পূজার রীতিনীতি পালিত হয়। জয়ন্তবাবু জানান, তাঁর স্ত্রী মাধবী ভট্টাচার্য, মেয়ে শ্রেয়া ভট্টাচার্য এবং বহু ভক্ত ও শিষ্য এই পূজায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই প্রাচীন পূজা শুধুমাত্র একটি পারিবারিক ঐতিহ্য নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অমূল্য অংশ যা কালের সীমানা পেরিয়ে আজও তার নিজস্বতা বজায় রেখেছে।








