ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক: প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর বর্ধমান, যা তার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত, সেখানে আজও শতাধিক বছরের পুরনো অসংখ্য কালী প্রতিমা মহাসমারোহে পূজিত হয়ে আসছে। আসন্ন কালীপুজো ২০২৬-এর ঠিক প্রাক্কালে, এই সমস্ত প্রাচীন কালী প্রতিমার ইতিহাস এবং তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিচিত্র কাহিনি নতুন করে জনসমক্ষে উপস্থাপন করলেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সর্বজিৎ যশ। তাঁর এই উপস্থাপনা বর্ধমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

সোনার কালী: এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশের ফসল: বর্ধমান শহরের অন্যতম প্রাচীন ও জাগ্রত কালী হলেন ‘সোনার কালী’। লোককথা অনুযায়ী, ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৯০০ খ্রিস্টাব্দ) রানি নারায়ণ কুমারী এক স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই সোনার কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানকার মূল বিগ্রহটি দশ মহাবিদ্যার অন্যতম ভুবনেশ্বরী কালী, যিনি প্রসন্নমূর্তিতে বিরাজমান। এই মূর্তিতে শিবের উপস্থিতি নেই। রানি নারায়ণ কুমারী একজন ব্রাহ্মণ কুমারীকে বেদীর নিচে প্রতিষ্ঠা করে অষ্টধাতুর এই ভুবনেশ্বরী মূর্তি স্থাপন করেন। ভুবনেশ্বরী কালীর ডানদিকে দক্ষিণাকালী এবং বাঁদিকে মঙ্গলচণ্ডী দেবীর অবস্থান। মন্দিরের ঈশান কোণে রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। লোকবিশ্বাসে প্রচলিত আছে যে, মা ভুবনেশ্বরীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার সময় এখানে একটি শিশুকন্যাকে জীবন্ত অবস্থায় পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। কালী পুজো উপলক্ষে আজও এই মন্দিরে অগণিত ভক্তের সমাগম হয়, তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মূল মন্দিরের দক্ষিণ দিকে দুটি নারায়ণীশ্বর শিবমন্দির ও একটি বেলগাছ রয়েছে। দেবীর সিংহাসনটি রুপোর তৈরি এবং বেদিটি শ্বেতপাথরের। সোনার কালীবাড়ির প্রধান পুরোহিত শিবপ্রসাদ ঘোষাল জানান, মন্দিরের সারা বছরের যাবতীয় খরচ ডঃ প্রণয়চাদ মহতাব বর্ধমান দেবসেবা অফিস মারফত প্রদান করেন।
কঙ্কালেশ্বরী কালী: প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিস্ময়
কাঞ্চননগরের কঙ্কালেশ্বরী কালী মূর্তিটি প্রত্নতত্ত্ববিদ ও মূর্তিতত্ত্ববিদদের কাছে এক অনবদ্য বিস্ময়। এই মূর্তিটির উৎপত্তি ও প্রকৃতি নিয়ে বহু জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। কেউ এটিকে বৌদ্ধ দেবী, কেউ জৈন দেবী, আবার কেউ বাংলার নিজস্ব শাক্ত সম্প্রদায়ের উপাসিতা উগ্রমূর্তি বলে মনে করেন। মূর্তিটি কালো পাথরের তৈরি এবং একসময় এর ওপর কালো রং মাখানো হয়েছিল। পায়ের দিকের রং উঠে যাওয়ায় ভিতরের কালো পাথর দৃশ্যমান। প্রায় সাড়ে তিন হাত লম্বা ও দেড় হাত চওড়া এই মূর্তিটি মন্দিরের দেওয়ালে সাঁটা আছে। দেবীর আকৃতি কঙ্কালের মতো, যা এটিকে অন্যান্য কালী মূর্তি থেকে স্বতন্ত্র করেছে।


দুর্লভা কালী: গোপন মূর্তি ও শেয়াল ভোগ :-
লাকুড্ডির কাছে অবস্থিত দুর্লভা কালী মন্দিরটিও প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন। স্থানীয়দের কাছে এটি “দুল বালা” কালী নামেও পরিচিত। এই মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, মায়ের যে মূর্তিটি সর্বসাধারণের দর্শনের জন্য রাখা হয়, তার পিছনে রয়েছে আসল পাথরের মূর্তি। একটি ছোট পিতলের সিংহাসনে মায়ের মাথার পিছনে এই আসল মূর্তিটি স্থাপিত। প্রতিদিন পূজার সময় এই পাথরের মূর্তি নামিয়ে পূজা করা হয়। কালো পাথরের এই মূর্তিতে মায়ের চোখ, মুখ ও কান অত্যন্ত নিপুণভাবে খোদাই করা হয়েছে, যা কাছ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। বাকি অংশ অমসৃণ পাথরের খণ্ড মাত্র। মন্দিরের একই স্থানে শিবমন্দির, নারায়ণ মন্দির ও তুলসি মঞ্চ রয়েছে। দুর্লভা কালীকে অত্যন্ত জাগ্রত দেবী হিসেবে মানা হয়। এখানে মায়ের পূজা ছাড়াও প্রতিদিন তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা হয়। প্রতিদিন যে ভোগ নিবেদন করা হয়, তা ‘শিব ভোগ’ নামে পরিচিত এবং একটি বাঁধানো বেদীতে রাখা হয়, যা প্রতিদিন শিয়ালেরা খেয়ে যায়। বৈশাখ মাসের সংক্রান্তির দিন এখানে মহা ধুমধাম সহকারে পূজা হয়। পূর্বে প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় ছাগ বলি হলেও, এখন শুধুমাত্র দুর্গাপূজার অষ্টমী ও নবমীতে ছাগ বলি হয়।
ফৌজদারি কালী: এক ঐতিহাসিক আইনি লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি- শহরের প্রাণকেন্দ্র খোসবাগানে আজও প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে পূজিত হন ফৌজদারি কালী। এটি বাগদি সম্প্রদায়ের কালী নামেই পরিচিত। আজও এই কালীকে কেন্দ্র করে এক বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের (১৯৩৮-৩৯ খ্রিস্টাব্দ) পূর্বে ফৌজদারি কালীমা বাগদি পাড়ার কালী রূপে পূজিতা হতেন। সেই সময় খোসবাগানের যে ক’ঘর আদিবাসী ছিলেন, তাঁরা সকলেই স্বেচ্ছায় এই পুজো শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে এক সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ মসজিদের সামনে দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া নিয়ে আপত্তি তোলে। ফলস্বরূপ, বেশ কিছুদিনের জন্য একাধিক প্রতিমার নিরঞ্জন বন্ধ হয়ে যায় এবং শহরের ভেরি খানা এলাকায় মাসাধিককাল এই সব প্রতিমা পড়ে থাকে।
এই অপমানের প্রতিবাদ করতে বর্ধমানের বিশিষ্ট আইনজীবী গিরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের গৃহে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে বলাই মুখোপাধ্যায়, শ্রীকুমার মিত্র, রাজকৃষ্ণ দত্ত, তারাপদ পাল, প্রাণদা মুখোপাধ্যায়, প্রণবেশ্বর সরকার প্রমুখ তৎকালীন বর্ধমানের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। ঐ বৈঠকে স্থির হয় যে, তাঁরা যেকোনো একটি প্রতিমা নিয়ে আইন অমান্য করে নিরঞ্জন সম্পন্ন করবেন। তখনকার দিনে বারোয়ারী পূজা বা সার্বজনীন পূজার চল ছিল না; সমস্ত প্রতিমাই বাড়ীর প্রতিমা হিসাবে পূজিত হতো। সেহেতু বাড়ীর প্রতিমা নিয়ে আইন অমান্য করলে বাড়ীর মালিকের উপর সমস্ত দায় বর্তাবে এই চিন্তায় কেউ সেই প্রচেষ্টায় সাড়া দিতে সাহস পাননি। কিন্তু এই প্রস্তাব যখন খোসবাগান সরস্বতীতলার প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায়, তখন যতীন্দ্রনাথ বিষ্ণু মহাশয়ের মাধ্যমে ওই বাগদি পাড়ার কুল গাছতলার কালী প্রতিমা পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়।
সেই মোতাবেক ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ৩০শে কার্তিক (১৫ নভেম্বর, ১৯৩৮) রাত্রি ৮ ঘটিকায় স্থানীয় যুবকেরা একটি ঢোল ও একটি কাসি নিয়ে তিনকড়ি মুখোপাধ্যায় নামক এক যুবকের মাথায় প্রতিমাকে চাপিয়ে শহর পরিক্রমায় বের হন। তখন বর্ধমান থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার ছিলেন মহম্মদ বাবর আলি। তিনি ওই শোভাযাত্রাকে বাধা না দিয়ে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শোভাযাত্রা নিয়ে গিয়ে বিসর্জন সম্পন্ন করার পর ওই সমস্ত যুবকদের গ্রেপ্তার করেন এবং তাদের এই কর্মের জন্য কালীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করেন। বর্ধমান আদালতে আইন অমান্য ও অন্যান্য মিথ্যা অপরাধে তাদের ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা হয়। তখনকার ব্যারিস্টার মহল বিনা পারিশ্রমিকে মহামান্য হাইকোর্টে আপিল করে সকলকে মুক্ত করে আনেন এবং তখন থেকে শোভাযাত্রা করার আইন সম্মত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকেই এই দেবী ‘ফৌজদারি’ কালী নামে খ্যাত। বর্তমানে ফৌজদারি কালী মায়ের পুজো ও শোভাযাত্রা বেশ ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়, যা এই অঞ্চলের এক গভীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
বীরহাটার বড়মা কালী: বর্গী হটাও আন্দোলনের স্মৃতি:- বীরহাটা বড়মা কালীকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত আছে অসংখ্য কাহিনি। শোনা যায়, জি.টি. রোডের পীচ রাস্তা যখন নির্মাণ করা হচ্ছিল, তখনও এই দেবী বিরাজমান ছিলেন। বাঁকা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চল একসময় জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। রাস্তা নির্মাণের কাজ চলাকালীন শ্রমিকেরা মাটি কাটতে কাটতে এখানে একটি বেদীর অস্তিত্ব খুঁজে পান। এইটুকুই এই মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়; এর থেকে বিস্তারিত তথ্য অনেকটাই জনশ্রুতি নির্ভর।
এ কথাও জনশ্রুতি যে, একসময় বর্ধমান বর্গী হামলার শিকার হয়েছিল। এই বর্গীদের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে জনগণ সংগঠিত হতে শুরু করে। কথিত আছে, এই অঞ্চল থেকেই জনগণ ‘বর্গী হটাও’ অভিযান চালায়। আজকের ‘বীরহাটা’ শব্দটি সেই ‘বর্গী হটাও’ শব্দেরই পরিবর্তিত রূপ বলে অনেকে মনে করেন। আবার কারো কারো মতে, পুরাকালে অনেক বীরাচারী সন্ন্যাসী এখানে আসতেন এবং সেখান থেকেই এই এলাকার নামকরণ হয়েছে ‘বীরহাটা’। বর্ধমানের প্রাচীন লোকজনের কাছ থেকে আরও জানা যায় যে, তখনকার দিনে ম্যালেরিয়া ও মহামারির প্রকোপ থেকে মুক্তি লাভের জন্য রক্ষাকালী পুজো করা হত। অনুমান করা হয়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাঁশ, খড় ও তালপাতার ছাউনি দিয়ে বেদিটিকে সুদৃঢ়ভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং এই জায়গার ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। সেই সময় দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলের কোনো এক ঘোষাল পরিবার দেবীর পূজার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এই সমস্ত লোককথা ও ইতিহাস বীরহাটার বড়মা কালীকে এক অনন্য মহিমা দান করেছে।
বহ্নিবলয় সৎকার সমিতির পুজো:
স্বাধীনতার পূর্বে শ্যামবাজারের অপর্ণাঘাটের (সঠিক হবে অর্পণাঘাট) বহ্নিবলয় সৎকার সমিতির কালীপুজো চালু হয়েছিল। সমিতির মতানুযায়ী, এই পুজো প্রায় ৬৫-৭০ বছরের পুরনো। কালীপুজোর রাতে ছাগ, আখ সহ অন্যান্য ফলের বলি হয়। পুজো উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং আশেপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ভোগপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। এই পুজো স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ত্রিকোণা পুকুর কালী: উদয় সংঘের তত্ত্বাবধানে
বর্ধমান শহরের জি.টি. রোডের ওপর অবস্থিত ত্রিকোণা পুকুর কালী মন্দিরটি প্রায় ১১০ বছরের পুরাতন দেবী। উদয় সংঘের তত্ত্বাবধানে এই পুজো মহা ধুমধাম সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে সারা বছরই মায়ের মূর্তি বিদ্যমান থাকে। বাৎসরিক কালীপুজো ছাড়াও প্রত্যেক অমাবস্যায় মায়ের বিশেষ পূজা ও ভোগ বিতরণ করা হয়। মায়ের প্রতিদিন দু’বেলা পূজা হয়। ত্রিকোণা কালী মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় সাড়ে তিন ফুটের মতো, যা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
ছিন্নমস্তা কালী: পুলিশ লাইনের কাছে
জি.টি. রোডের ধারেই পুলিশ লাইনের কাছে অবস্থিত ছিন্নমস্তা মায়ের মন্দির। পূর্বে জি.টি. রোডের ধারে মায়ের পূজা হলেও, এখন বাঁধানো মন্দিরে মায়ের পূজা হয়। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় মায়ের পূজা খুব ধুমধাম সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। মায়ের মন্দিরটি ভাদ্র মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ভাদ্র মাসেও এখানে বিশেষ পূজা হয়।
অফিসার্স কলোনি কালী: ১৫০ বছরের বেশি পুরোনো জি.টি. রোডের ধারে অফিসার্স কলোনি কালী মন্দিরটি অবস্থিত। এই কালী মন্দিরটি প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বছরের পুরোনো। স্বর্গত গোলাপ সুন্দরী দাসীর নামে মন্দির সংলগ্ন জায়গাটি ছিল বলে জানা যায়। কথিত আছে, তাঁর বংশেরই কোনো সদস্য এই কালী প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরে সারা বছরই পূজা হয়, তবে বাৎসরিক কালীপুজোর রাতে এখানে মহা ধুমধাম করে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
কমলাকান্ত কালী: শাক্ত সাধকের সিদ্ধিক্ষেত্র
১২১৬ বঙ্গাব্দে (১৮০৯-১০ খ্রিস্টাব্দ) শক্তি সাধক কমলাকান্তকে চান্না গ্রাম থেকে বর্ধমানে নিয়ে আসেন মহারাজ তেজ চাঁদ এবং তাকে সভাপণ্ডিত করেন। তখন থেকেই সাধক কমলাকান্ত বর্ধমানে তাঁর সাধনার ক্ষেত্র খুঁজে পান। মহারাজ তেজচাঁদ কোটালহাটে বারো কাঠা জমির উপর মায়ের মন্দির এবং সাধকের থাকার বাসস্থান তৈরি করে দেন। সাধক কমলাকান্ত পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে দিনের পর দিন সাধনা করতে লাগলেন। মন্দিরের পিছনে বেলগাছের তলায় কাল ভৈরবের পূজা চলতে থাকে, কারণ শক্তিকে জাগ্রত করতে শিবের আরাধনা অপরিহার্য। একটি নিমগাছের তলায় তিনি চণ্ডাল, শৃগাল ও বানরের মুখ দিয়ে ত্রিমুণ্ডীর আসন পেতেছিলেন। দীর্ঘ সাধনার পর তিনি সিদ্ধি লাভ করেন। কমলাকান্ত মারা গেলেও এই স্থানটি হিন্দু তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

কমলাকান্ত কালী মায়ের মূর্তিটি প্রায় ১২-১৪ হাত লম্বা এবং এটি মাটির মূর্তি। সারা বছরই মায়ের মূর্তি থাকে, তবে আশ্বিন মাসের দ্বাদশী অথবা ত্রয়োদশীতে এই মূর্তি নিরঞ্জন করা হয় এবং পুনরায় নতুন মূর্তি তৈরি হয়। নিত্য পূজা হয় বেশ শুদ্ধাচারে এবং নিত্য মায়ের ভোগ হয়। ঠিক মধ্যাহ্নে মায়ের অন্নভোগ এবং সন্ধ্যায় মায়ের লুচি-মিষ্টি ভোগ নিবেদন করা হয়। ত্রিসন্ধ্যায় মায়ের আরতি ও পূজা হয়। প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় বারের পূজা উপলক্ষে বহু ভক্ত সমাগম হয়। প্রতি অমাবস্যায় মায়ের হোম হয়। আগে ছাগ বলি হলেও, এখনও শ্যামা পূজা এবং মানত থাকলে ছাগ বলি হয়। নববর্ষ, বিজয়া দশমী, মঙ্গলচণ্ডী পূজা, বিপদত্তারিণী পূজার দিনগুলিতে এখানে বিশেষ অনুষ্ঠান চলে। শ্যামাপূজার সময় বেশ আড়ম্বরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কার্তিক মাসের ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন কমলাকান্ত মন্দিরে প্রতি বছর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (বর্ধমান শাখা), বর্ধমান সংস্কৃতি পরিষদ ও কমলাকান্ত কালী সমিতি সম্মিলিতভাবে কমলাকান্ত দিবস পালন করে, যা এই স্থানটির সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
নির্মল ঝিল আদি কালী: শ্মশানের প্রান্তে দেবীর আবাহন। বর্ধমানের নির্মল ঝিল শ্মশানের কালীপুজো প্রায় ৬৫ বছরের পুরনো বলে স্থানীয় মানুষ দাবী করেন। এই শ্মশান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের ভাগ্না লালা নির্মলপ্রকাশ নন্দ। তাঁর নাম অনুসারেই শ্মশানের নামকরণ হয় নির্মলঝিল। শ্মশান প্রতিষ্ঠার পর এখানে কালী প্রতিষ্ঠা করা হয়। কালীপুজোর রাতে এলাকার মানুষ মহা ধুমধাম করে মায়ের পূজা করে এবং এই পুজো উপলক্ষে বহু ভক্তের সমাগম হয়। মায়ের মূর্তিটি উত্তর মুখে অবস্থিত, যা এই শ্মশানকালীর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
খোসবাগান খিন্নিতলা দীন সমিতির কালী:
খোসবাগান শ্যামসায়র পাড়ে খিন্নিতলা দীন সমিতির কালী মায়ের প্রতিষ্ঠার সঠিক তথ্য জানা না গেলেও, লোকমুখে শোনা যায় যে খিন্নি গাছের তলায় মায়ের পূজা হত। এই কারণেই মায়ের নাম হয়েছে খিন্নিকালী মা। পুজোর রাতে ছাগ ও ফল বলি হয়। এছাড়া এখানে দরিদ্রনারায়ণ সেবা অনুষ্ঠিত হয় এবং বিসর্জনের দিন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জন করা হয়। পুজোর কদিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই একই বেদীতে চৈত্র মাসে রক্ষা কালী পুজো হয়ে থাকে, যা এই অঞ্চলের ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
বর্ধমানের এই কালীপুজো গুলি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, এগুলি এই অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের জীবন্ত দলিল। আসন্ন কালীপুজো ২০২৬-এর আগমনকালে এই প্রাচীন দেবীদের আরাধনা বর্ধমানের চিরায়ত ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে নিয়ে যাবে বাংলার গৌরবময় ইতিহাস।








