কুণাল চট্টোপাধ্যায়, জামালপুর: রাজ্যজুড়ে যখন তোলাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক তৃণমূল নেতার গ্রেপ্তারির ঘটনা শিরোনামে, ঠিক তখনই সোমবার রাতে জামালপুর থানার পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন স্থানীয় বিজেপি নেতা তথা ১ নং মণ্ডলের সহ-সভাপতি সুশান্ত মণ্ডল। এই গ্রেপ্তারিতে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো, নিজের দলের সহ-সভাপতির পতন নিয়ে দলের সভাপতির প্রকাশ্য স্বস্তির প্রকাশ, যা রাজ্য-রাজনীতির সমস্ত শিষ্টাচারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃত সুশান্ত মণ্ডলের বিরুদ্ধে মারধর, হুমকি, শ্লীলতাহানির মতো অভিযোগ জমা পড়েছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার বর্ধমান আদালতে ধৃতকে পেশ করা হলে তদন্তের স্বার্থে আদালত ধৃতকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের আদেশ দিয়েছেন।

সুশান্ত মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবন রীতিমতো নাটকীয়। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে যিনি কাস্তে-হাতুড়ি চিহ্নে সিপিএমের প্রার্থী হিসেবে শাসকদলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লড়াই করেছিলেন, সময়ের ফেরে তিনিই রাতারাতি গেরুয়া বসন গায়ে চাপিয়ে নেন। শুধু দলে যোগ দেওয়াই নয়, অতি দ্রুত তিনি জামালপুর ১ নং মণ্ডলের সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও বাগিয়ে নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য তাঁর এই ১৮০ ডিগ্রি মতাদর্শ পরিবর্তনকে ‘সুবিধাবাদ’ বলেই ব্যাখ্যা করছেন। দলের আদি নেতাদের কাছে তাঁর এই দ্রুত উত্থান যে মোটেই ভালোভাবে গৃহীত হয়নি, তা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
দলে পদ পেলেও সুশান্ত মণ্ডলের স্বভাবজাত ‘বিদ্রোহী’ বা একরোখা সত্তা মোটেও প্রশমিত হয়নি। কিছুদিন আগেই তিনি সশরীরে দলবল নিয়ে জামালপুর থানায় গিয়ে খোদ দলেরই মন্ডল সভাপতির বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ দেখিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন। সম্প্রতি তাঁর ক্ষোভের তির ঘুরে যায় নিজের দলেরই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। কলকাতার রাজ্য বিজেপি অফিসে গিয়ে তিনি ১ নং মণ্ডলের সভাপতি প্রধান চন্দ্র পাল এবং খোদ বিজেপি বিধায়ক অরুন হালদারের বিরুদ্ধে অনুগামীদের নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এমনকি বিধায়কের বিরুদ্ধে বালি খাদান থেকে ৩০ লক্ষ টাকা তোলা আদায়ের অভিযোগও তোলেন সুশান্ত মণ্ডল।

এখানেই নিয়তির পরিহাস। যে পুলিশের বিরুদ্ধে একসময় তিনি বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন, সেই পুলিশের হাতেই শেষমেশ তাঁকে হাতকড়া পরতে হলো। আর যে দলের তিনি সহ-সভাপতি, সেই দলই আজ তাঁর পাশে দাঁড়ানো তো দূর অস্ত, বরং উল্লাস প্রকাশ করছে।
সুশান্ত মণ্ডলের এই গ্রেপ্তারে সবচেয়ে বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন জামালপুর ১ নং মণ্ডলের সভাপতি প্রধান চন্দ্র পাল। নিজের দলেরই সহ-সভাপতির গ্রেপ্তারির প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত ব্যাকরণকে ওলটপালট করে দেয়। তিনি বলেন, “ওর (সুশান্ত মণ্ডল) অনেক আগেই গ্রেপ্তার হওয়া উচিত ছিল। ও আমার এবং দলের বিধায়কের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অনেক আজেবাজে কথা বলেছে। ও আসলে ভারতীয় জনতা পার্টির সংস্কৃতিটাই জানে না।”
জামালপুরের এই ঘটনা বাংলায় দলবদলের হিড়িক ও ভিন্ন মতাদর্শের মেলবন্ধন আসলে কতটা ঠুনকো, তা আবারও প্রমাণ করে দিল। এককালের কট্টর বামপন্থী যখন বিজেপির পদাধিকারী হয়ে দলেরই অনুশাসনের মুখে ছাই দিয়ে বিক্ষোভ দেখান, আর তাঁর গ্রেপ্তারিতে নিজের দলেরই সভাপতি যখন বিজয়োল্লাস করেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়— জামালপুর বিজেপির অন্দরে চরম কোন্দল বিদ্যমান। আইন তার নিজস্ব পথেই চলবে, তবে এই গ্রেপ্তারির ঘটনা জামালপুরের রাজনৈতিক সমীকরণকে যে আরও জটিল করে তুলল, তা বলাই বাহুল্য।








