ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক, বর্ধমান: পূর্ব বর্ধমানের বৈকুণ্ঠপুরে ব্যানার্জি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী জয় দুর্গা পুজো এবছর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই পুজোয় এবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নতুন মূর্তি, যা পুরনো আদল বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। মহারাজা কীর্তিচাঁদের দান করা ভূমিতে আজও পঞ্চমুণ্ডির আসনে তন্ত্রমতে পূজিত হন দেবী জয় দুর্গা।

বৈকুণ্ঠপুরের ব্যানার্জি পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শের শাহের আমলেরও আগে থেকে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। দেবী এখানে চতুর্ভূজা জয় দুর্গা রূপে পূজিত হন। অন্যান্য দুর্গা পুজোর থেকে এর বিশেষত্ব অনেক। এখানে দেবীর বিসর্জন হয় না, পরিবর্তে দু-তিন বছর অন্তর কেবল অঙ্গরাগ করা হয়। গোপাল ব্যানার্জি, পরিবারের এক সদস্য জানিয়েছেন, “প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর ধরে এই পুজো চলে আসছে। তখন থেকে একই মূর্তিতে পুজো হয়ে আসছে। শুধুমাত্র দু-তিন বছর অন্তর অঙ্গরাগ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে মূর্তিটি একেবারে বসে যাওয়ায় এই বছর একই আগের মূর্তির আদলেই নতুন মূর্তি গড়ে তার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এবছর থেকে নতুন মূর্তিতেই হবে পুজো।”
কথিত আছে, ব্যানার্জি পরিবারেরই এক তান্ত্রিক সদস্য কাশী থেকে পূর্ব বর্ধমান এসে নদীর তীরে পর্ণকুঠীর নির্মাণ করে তন্ত্রমতে দেবীর পুজো শুরু করেন। পরে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মহারাজ কীর্তিচাঁদ জমি দান করেন, যেখানে মন্দির নির্মাণ করে দেবী জয় দুর্গাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকেই আজও সন্ধিপূজোর সময় বর্ধমান মহারাজার নামেই সংকল্প করা হয়। পুজোর স্থান পরিবর্তন হলেও আজও নিয়ম বদলায়নি।

সারাবছরই দেবীর নিত্যসেবা ও দু’বেলা ভোগ নিবেদন করা হয়। সন্ধ্যা আরতির পর শীতলভোগ দেওয়া হয়। অন্যান্য পদের পাশাপাশি ভোগে প্রতিদিন মাছ থাকে, এবং অষ্টমীতে মাগুর মাছের পদ নিবেদন করা হয়। পুজো ঘিরে রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনিও। পরিবারের সদস্যরা জানান, এক বছর অষ্টমীর দিন অনেক খুঁজেও মাগুর মাছ পাওয়া যায়নি। পরে পাশের বাগদিপাড়া থেকে এক মহিলা এসে মাছ দিয়ে যান। তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, এক বৃদ্ধা তাকে ওই মাছ দিয়ে ব্যানার্জি বাড়িতে দিয়ে আসতে বলেছিলেন। পরিবারের বিশ্বাস, দেবী স্বয়ং সেই মাছ দিয়ে গিয়েছিলেন।
দেবীর মূর্তিতেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পরিবারের সদস্য মানস ব্যানার্জি জানিয়েছেন, দেবী এখানে জয়দুর্গা রূপে পরিচিত। দেবীর চারটি হাত এবং গায়ের রং হলুদ। এমনকি অসুরের গায়ের রং সবুজ। দেবীর বাহন সিংহকেও দেখতে অনেকটা ঘোড়ার মতো এবং তার গায়ের রং সাদা। প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর ধরে এই রূপেই দেবী ব্যানার্জি পরিবারে পূজিত হয়ে আসছেন। এই পুজো একদিকে যেমন ৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, তেমনই তন্ত্রমতে পুজোর নিজস্বতা ও অলৌকিক কাহিনি একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।








