২০২৬ সালের রথযাত্রার উন্মাদনার মাঝেও পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের কুলীনগ্রাম আজও ধারণ করে আছে পুরীর জগন্নাথদেবের রথের সঙ্গে এক অলৌকিক সংযোগের স্মৃতি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশে একদা এই গ্রাম থেকে পাঠানো হতো রথের পবিত্র ‘পট্টডোরী’। কালের নিয়মে সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্ত হলেও, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বৈষ্ণবীয় পরম্পরা আজও অনস্বীকার্য। এই ঐতিহাসিক যোগসূত্র সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন।


কুণাল চট্টোপাধ্যায়, জামালপুর: আষাঢ়ের আকাশে মেঘের আনাগোনা। দিকে দিকে বেজে উঠেছে কাঁসর-ঘণ্টা, টান পড়ছে জগন্নাথদেবের রথের রশিতে। ২০২৬ সালের এই রথযাত্রার মহা-উন্মাদনার মাঝেই সুদূর ওড়িশার পুরীধামের সঙ্গে আজও এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এক শান্ত, শ্যামল গ্রাম— পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুরের কুলীনগ্রাম। এই গ্রামের ধুলোবালিতে আজও মিশে রয়েছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতি এবং শ্রীক্ষেত্র ধামের এক অনন্য ঐতিহাসিক মেলবন্ধন।
একসময় এই গ্রাম থেকেই প্রতিবছর রথযাত্রার আগে জগন্নাথদেবের জন্য পাঠানো হতো বিশেষ ‘পট্টডোরী’ বা রথের পবিত্র দড়ি। কালের নিয়মে আজ সেই প্রথা অবলুপ্ত হলেও, ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আজও রোমাঞ্চ জাগে ভক্তহৃদয়ে।

জনশ্রুতি এবং বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুযায়ী, এই ঐতিহ্যবাহী প্রথার সূচনা হয়েছিল স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর হাত ধরে। কথিত আছে, একবার পুরীতে রথযাত্রার সময় গুণ্ডিচা মন্দিরের সামনে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। জগন্নাথদেবকে যখন সিংহাসন থেকে নামিয়ে রথে তোলা হচ্ছিল (যাকে ওড়িয়া ভাষায় ‘পাহণ্ডি’ বলা হয়), তখনই হঠাৎ ছিঁড়ে যায় রথের প্রধান দড়ি তথা ‘পট্টডোরী’। মহাপ্রভুর উপস্থিতিতেই ঘটে এই বিপত্তি।
সেই সময়ই সেখানে উপস্থিত কুলীনগ্রামের পরম বৈষ্ণব ভক্ত তথা বসু পরিবারের পূর্বপুরুষ সত্যরাজ খাঁকে ডেকে শ্রীচৈতন্য নির্দেশ দেন, প্রতি বছর রথযাত্রার আগে কুলীনগ্রাম থেকে নতুন পট্টডোরী তৈরি করে নিয়ে আসতে হবে। চৈতন্যচরিতামৃতের সেই বিখ্যাত শ্লোক আজও স্মরণ করেন গ্রামবাসীরা—
“কুলীন গ্রামের কহে সম্মান করিয়া,
প্রতি অব্দ আসিবে তুমি পট্টডোরী লইয়া।”
মহাপ্রভুর সেই আদেশকে পরম আশীর্বাদ হিসেবে মাথায় তুলে নিয়েছিলেন কুলীনগ্রামের ভক্তরা। গ্রামের লক্ষ্মীকান্ত বসু সহ বহু চৈতন্যভক্ত প্রতি বছর নামসংকীর্তন করতে করতে, খোল-করতাল বাজিয়ে পায়ে হেঁটে সুদূর পুরীধামে যেতেন। তৎকালীন কুলীনগ্রাম এলাকায় রেশম ও পশমের প্রাচুর্য ছিল। সেই রেশম-পশম অত্যন্ত নিষ্ঠা ও যত্নের সঙ্গে বুনে তৈরি হতো দু-গাছা মজবুত পট্টডোরী। যুগের পর যুগ ধরে এই বসু পরিবারই জগন্নাথদেবের রথের পট্টডোরীর প্রধান সেবাইত হিসেবে পুরীধামে সমাদৃত হতেন।

সময়ের চাকা ঘুরেছে, বদলে গিয়েছে অনেক সমীকরণ। একসময় সরাসরি পট্টডোরী পাঠানো বন্ধ হয়ে গেলেও ঐতিহ্য রক্ষার্থে কুলীনগ্রাম থেকে পাঠানো হতো পাট ও শণ দিয়ে তৈরি বিশেষ উপকরণ। পুরীর মূল দড়ির সঙ্গে সেই উপকরণ স্পর্শ করিয়েই নিয়ম রক্ষা করা হতো। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও কালের নিয়মে বসু পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ায় আজ সেই প্রক্ষালন প্রথাও সম্পূর্ণ স্তব্ধ।
এই ঐতিহ্য প্রসঙ্গে আক্ষেপের সুরে কুলীনগ্রামের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত শচীনন্দন মুখোপাধ্যায় বলেন, “একবার ওই রথের সময় পুরীতে গুন্ডিচা মন্দিরে একটা ঘটনা ঘটল। যে দড়ি দিয়ে জগন্নাথ সিংহাসনে বাঁধা থাকেন বা যাকে ধরে রথে নিয়ে যাওয়া হয়, তাকেই বলে ‘পট্টডোরী’। পাণ্ডারা যখন ঠাকুরকে নামাচ্ছেন, দড়ি ছিঁড়ে গেল। তখন চৈতন্যদেব সত্যরাজকে ডেকে বললেন, ‘আজি হইতে হইলে তুমি পট্টডোরীর সেবাইত।’ তিনি কুলীনগ্রামকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর পট্টডোরী নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। এই এলাকায় তখন রেশম-পশমের অভাব ছিল না। সেই নমুনা দিয়ে দু-গাছা দড়ি তৈরি করে প্রতি বছর রথের আগে নিয়ে যাওয়ার প্রথা শুরু হয়েছিল। সেই থেকেই বসু বংশ পুরীর পট্টডোরীর সেবাইত নিযুক্ত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সেই ঐতিহ্য মেনে পট্টডোরী পাঠানো হয়েছে।”
আজ আর সংকীর্তন করতে করতে পায়ে হেঁটে কুলীনগ্রাম থেকে কেউ পুরী যান না। কোলাহলমুখর রথযাত্রার দিনে পূর্ব বর্ধমানের এই শান্ত গ্রামটিতে শুধুই দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রাচীন স্মৃতি। তবে প্রথা বন্ধ হলেও, কুলীনগ্রামের মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও অম্লান হয়ে রয়েছে জগন্নাথদেব ও শ্রীচৈতন্যের সেই অমর সংযোগের সোনালী অধ্যায়।








